সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন মসজিদে চেয়ারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, সঙ্গে বেড়ে চলেছে চেয়ারে বসে নামাজ আদায়কারীর সংখ্যাও। হাঁটু, কোমর বা শরীরের অন্য কোনো অঙ্গে সামান্য ব্যথা অনুভব করে ডাক্তারের কাছে পরামর্শ নিতে গেলে ডাক্তার বলে দেন- আপনি নামাজি ব্যক্তি হলে চেয়ারে বসে নামাজ পড়বেন। বেশি উঠবোস করলে ব্যথা বৃদ্ধি পেতে পারে। বেচারা রোগী মানুষ, করবেও বা কী? এসব কারণে সামান্য ব্যথা হলেই এখন চেয়ারে বসে নামাজ পড়ার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এ কারণে প্রায় মসজিদে চেয়ারও সংযুক্ত হচ্ছে কল্পনাতীতভাবে। কাতারের মাঝখানে বা পাশে চেয়ার স্থাপন করার কারণে বিভিন্নভাবে মুসল্লিদের কাতারে যে মিলে দাঁড়ানোর কথা, তাতেও অনিয়ম দেখা দেয়। আবার কিছু লোক নিচে উপবিষ্ট, কিছু চেয়ারে, তাতেও কেমন যেন অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। যাতে মসজিদের যে পরিবেশ তাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। এ ধরনের আরো বহু কারণে মুসলমানরা উৎসুক হয়ে উঠেছেন চেয়ারে বসে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে শরিয়তের নীতি কী, তা জানতে।
এমনই একজন উৎসুক ব্যক্তি উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগে এ ব্যাপারে একটি ফতোয়া চেয়েছেন। দারুল উলুম দেওবন্দের কেন্দ্রীয় দারুল ইফতার পক্ষ থেকে কয়েক পৃষ্ঠার একটি নিবন্ধ লিখে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে, উত্তর দেন মুফতি যাইনুল ইসলাম কাসেমী। যা তাদের অনলাইন ফতোয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতেও বিষয়টি জানার দাবি রাখে, সে কারণে ওই ফতোয়াটি বাংলা ভাষা তুলে ধরেন মুফতি এনামুল হক কাসেমী
দাঁড়াতে ও সিজদা করতে সক্ষম এমন ব্যক্তির জন্য নামাজে কিয়াম বা দাঁড়ানো ফরজ এবং এটি নামাজের একটি রুকন। যদি দাঁড়ানো বা সিজদাদানে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ফরজ নামাজ বসে আদায় করা হয়, তবে নামাজের ফরজ বা রুকন ছেড়ে দেওয়ার কারণে নামাজ হবে না। নামাজ পুনরায় পড়তে হবে। (দুররে মুখতার, যাকারিয়া বুক ডিপো ২/১৩২)
এমনকি যদি নামাজের কিছু অংশ দাঁড়াতে সক্ষম, পুরো সময় দাঁড়িয়ে থাকতে অপারগ, তবে যেটুকু সময় দাঁড়াতে পারবে তা কোনো লাঠি বা দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে হলেও সেটুকু দাঁড়ানো ফরজ। এমতাবস্থায় যদি না দাঁড়ায় এবং কোনো কিছুর ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়ানোর পরিবর্তে বসেই নামাজ আদায় করে, তবে নামাজ হবে না। (দুররে মুখতার ২/২৬৭)
যদি কোনো লোক দাঁড়াতে সক্ষম, কিন্তু রুকু-সিজদা বা শুধু সিজদা করতে সক্ষম নয়, তার জন্য বসে নামাজ আদায় করা জায়েজ। সে ইশারার মাধ্যমে রুকু-সিজদা করবে। এমতাবস্থায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করার চেয়ে বসে ইশারার মাধ্যমে নামাজ আদায় করা উত্তম। (দুররে মুখতার ২/৫৬৭), ফতোয়া আলমগীরী ১/১৩৬-তেও এরূপ রয়েছে।
যেসব অক্ষমতার কারণে দাঁড়ানোর আবশ্যিকতা রহিত হয়ে যায়, তা দুই প্রকার :
১। হাকিকি বা মৌলিক : এমন অক্ষম, যে দাঁড়াতে পারবে না।
২। হুকমি বা বিধানগত : এমন অক্ষম নয় যে, দাঁড়ানো সম্ভব না, বরং দাঁড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা অথবা এমন দুর্বলতা থাকে, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে অক্ষমতা বলে বিবেচিত, যেমন অসুস্থতা, যার ব্যাপারে অভিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তাররা পরামর্শ দেন যে দাঁড়ালে রোগ বৃদ্ধি পাবে অথবা সুস্থতা ফিরে আসতে বিলম্ব হবে কিংবা দাঁড়ানোর কারণে অসহনীয় ব্যথা অনুভূত হয়, এসব অবস্থায় বসে নামাজ আদায় করা জায়েজ। (দুররে মুখতার মাআ রদ্দুল মুহতার ২/৫৬৫)
যদি অসহনীয় ও অস্বাভাবিক ব্যথা না হয়, বরং সামান্য ব্যথা অনুভব হয়, তবে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে অক্ষমতা বলে বিবেচিত হবে না। এমতাবস্থায় বসে নামাজ আদায় করা জায়েজ নেই। (তাতারখানিয়া-যাকারিয়া বুক ডিপো-২/৬৬৭)
যে লোক দাঁড়াতে অক্ষম, কিন্তু মাটিতে বসে সিজদার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে সক্ষম, তবে তাকে মাটিতে বসে সিজদাসহকারে নামাজ আদায় করতে হবে। মাটিতে সিজদা না করে চেয়ারের ওপর বসে বা মাটিতে বসে ইশারা করে নামাজ আদায় করা জায়েজ হবে না। (তাতারখানিয়া-যাকারিয়া বুক ডিপো-২/৬৬৭)
যদি রুকু ও সিজদা করতে অপারগ, কিন্তু মাটিতে বসে ইশারা করে নামাজ আদায় করতে সক্ষম, তবে তাশাহুদ অবস্থার মতো বসা আবশ্যক নয়। বরং যেকোনোভাবেই চাই মহিলাদের তাশাহুদে বসার মতো বা যে আসনে বসলে আরাম হয়, সেভাবেই মাটিতে বসে ইশারা করে নামাজ আদায় করবে। চেয়ারে বসা উচিত নয়। কারণ শরিয়ত এমন অপরাগদের মাটিতে বসার ব্যাপারে পূর্ণ ছাড় দিয়েছে, যে আসনে সম্ভব হয়, সেভাবেই বসে নামাজ আদায় করবে। (দুররে মুখতার মাআ শামী-২/৫৬৬)
এমতাবস্থায় প্রয়োজন ছাড়া চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করলে কয়েকটি কারণে মাকরুহ হবে।