দুনিয়ার সুখ সুখ না, জান্নাতের সুখই আসল সুখ

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন কাজটি আল্লাহর নিকট সবচাইতে প্রিয়? তিনি বললেন, ‘ঠিক সময়ে নামায আদায় করা।’ তিনি (আবদুল্লাহ) পুনরায় বললেন, এরপর কোন কাজটি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়? নবী (সাঃ) বললেন, ‘পিতামাতার সেবা ও আনুগত্য করা। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কোন কাজটি? জবাবে নবী (সাঃ) বললেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদ করা।

দুনিয়া ক্ষনস্থায়ী, নিশ্চই আমিও দুনিয়ায় ক্ষনস্থায়ী

“ তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানুষের(কল্যাণের) জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।” -সূরা আল-ইমরান, আয়াত-১১০

দুনিয়ার দুঃখ দুঃখ না, জাহান্নারের দুঃখ আসল দুঃখ

হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমাকে দেখেছে এবং আমার উপর ঈমান এনেছে তার জন্য তো একবার মোবারকবাদ। আর যে আমাকে দেখে নাই তারপরেও আমার উপর ঈমান এনেছে তাকে বারবার মোবারকবাদ - মুসনাদ আহমাদঃ ৩/১০০

নামাজ বেহেস্তের চাবি

রাসুলে পাক (সা:) বলেছেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমার উম্মতের উপর সর্বপ্রথম নামাজ ফরজ করেছেন এবং কেয়ামতের দিন সবার আগে নামাজের হিসাব নয়া হবে।

কালেমা পড়ি, ঈমান আনি, বলি আমি মুসলিম

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন কাজটি আল্লাহর নিকট সবচাইতে প্রিয়? তিনি বললেন, ‘ঠিক সময়ে নামায আদায় করা।’ তিনি (আবদুল্লাহ) পুনরায় বললেন, এরপর কোন কাজটি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়? নবী (সাঃ) বললেন, ‘পিতামাতার সেবা ও আনুগত্য করা। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কোন কাজটি? জবাবে নবী (সাঃ) বললেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদ করা।

Thursday, February 27, 2014

হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদ

হক্কুল্লাহ হক্কুল ইবাদ

মোজাফফর হোসেন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, শুক্রবার, :২৭

রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসনাতাউ ওয়া ফিল আখিরাতে হাসনাতাউ ওয়া কিনা আজাবান্নার’, 
অর্থাৎহে আমাদের রব, তুমি আমাদেরকে পৃথিবীতে কল্যাণ এবং পরকালে কল্যাণ দান করো। আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে, ইসলাম শুধু মানুষকে বেহেশতের পথই দেখায়নি, ইসলাম মানুষকে সর্ববিধ পার্থিব উন্নতির পথও দেখিয়েছে। আল্লাহ মুসলমানদের কালের শান্তি পরকালে মুক্তি অর্জনের পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন।  বেশির ভাগ মুসলমানই আমরা মনে করে থাকি যে, আমরা যেসব ইবাদত-বন্দেগি করে থাকি, সেসব ইবাদতের প্রতিদান শুধু মৃত্যুর পরবর্তী জীবনেই ভোগ করা যায়, পার্থিব জীবন বা এই দুনিয়ার জীবনে তেমন কোনো সুবিধাদি পাওয়া যায় না। রকম ধারণা সত্য না অযৌক্তিক তা আলোচনাসাপেক্ষে পরিষ্কার হয়ে যায়। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টি পরকালের মুক্তি ব্যতীত ইবাদতের যাবতীয় প্রতিদান বা উপকারিতা মানুষ পৃথিবীতেই ভোগ করে থাকেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ পাক নিজেই ঘোষণা করেছেন- ‘যারা আল্লাহ তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে তাঁর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকে, তারাই কৃতকার্য (সূরা নূর : ৫২)



  আয়াত দ্বারা আল্লাহ দুনিয়া আখেরাতে কৃতকার্যের কথাই বুঝিয়েছেন। অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ ওয়াদা করেন- ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে সৎ কর্ম করে, আল্লাহ তাদের ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদের অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন (সূরা নূর : ৫৫) অন্য এক আয়াতে বলা হচ্ছে- ‘যে সৎ কর্ম করে সে নিজের উপকারের জন্যই করে আর যে অসৎ কর্ম করে তা তার ওপরই বর্তাবে। আপনার পালনকর্তা বান্দাদের প্রতি মোটেই জুলুম করেন না (সূরা হামিম সেজদা : ৪৬) কাজেই ইবাদতের উপকারিতা শুধু মৃত্যুর পরেই পাওয়া যাবে, এমনটি নয়
ইবাদতশব্দটি এসেছে আরবি ভাষারআবদুনশব্দ থেকে। আবদুন শব্দের অর্থ গোলাম এবং ইবাদত শব্দের অর্থ গোলামি করা। অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে নিয়ে তাঁরই আনুগত্য করা। আল্লাহ বলেন- ‘আমি জিন মানুষকে জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা শুধু আমারই আনুগত্য করবে (সূরা জারিয়া : ৫৬) মানুষের পুরো জীবনের যাবতীয় কাজ আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী করা বা না করাই হচ্ছে ইবাদত। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে- ‘তোমরা আনুগত্য করো এক আল্লাহ তাঁর রাসূলের, আর যদি তোমরা তা থেকে বিমুখ হও তাহলে জেনে রেখো আল্লাহ কাফেরদের ভালোবাসেন না (সূরা আল ইমরান : ৩২) ইবাদতের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তবে মানুষের কল্যাণ সাধন হচ্ছে ইবাদতের পারিপার্শ্বিক কর্তব্য। দুই উদ্দেশ্যে যেকোনো ভালো কাজ করার নামই ইবাদত। ইবাদতের পরিষ্কার একটি ধারণা পাওয়া যায় সূরা আল বাকারায়। বলা হয়েছে- ‘সৎ কর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎ কাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর, কিয়ামত দিবসের ওপর, ফেরেশতাদের ওপর এবং সমস্ত নবী-রাসূলগণের ওপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়স্বজন, এতিম-মিসকিন, মুসাফির-ভিক্ষুক মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্য। আর যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে-রোগে-শোকে যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণকারী, তারাই হলো সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেজগার (সূরা বাকারা : ১৭৭)
ইবাদত দুই প্রকার। হক্কুল্লাহ আর হক্কুল ইবাদ। হক্কুল্লাহ হচ্ছে সেই ইবাদত, যা আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। যেমন- তাওহিদ, রোজা, নামাজ, হজ, কোরবানি এবং হক্কুল ইবাদ, যা বান্দার সাথে সংযুক্ত যেমন- জাকাত, পিতা-মাতার অধিকার, নিকটাত্মীয়ের অধিকার, প্রতিবেশীর অধিকার, এতিম, ফকির-মিসকিনের অধিকার এবং সমস্ত মুসলিম অমুসলিমদের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত ইবাদতগুলো বান্দার সাথে সম্পৃক্ত ইবাদতগুলো কার্যকরী হওয়া বা নিশ্চয়তার পূর্বশর্ত। কেননা কেউ যদি প্রথম পর্যায়ের ইবাদত অর্থাৎ হক্কুল্লাহর ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক না হয়, তবে তার দ্বারা দি¦তীয় পর্যায়ের ইবাদত অর্থাৎ বান্দা সম্পর্কিত ইবাদত আশা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ কেউ যদি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা বিশ্বাস রাখতে না পারে, তাহলে তার পক্ষে দ্বিতীয় পর্যায়ের ইবাদতের নিশ্চয়তা প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়ে। যদি কেউ দুধরনের ইবাদতই সম্পন্ন করে থাকে, তাহলে সেই ইবাদতগুলোই মানবকল্যাণের তাৎপর্য বহন করবে
তাওহিদ হচ্ছে প্রথম ইবাদত, যা আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত। আল্লাহ ঘোষণা করেন- ‘হে মানুষ সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই’ (সূরা হুদ : ৬১) পবিত্র কুরআনের সূরা ইখলাসে বলা হয়েছে- ‘বলুন, তিনি আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়, তিনি অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তিনিও কারো থেকে জন্ম নেননি এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ একজনও নেই (সূরা ইখলাস : -) এই তাওহিদ বা একত্ববাদের স্বীকৃতি প্রদানের ফলে বান্দার ওপর অত্যাবশ্যক হয়ে যায় নবী-রাসূল, বেহেশত-দোজখ, কেয়ামত, আখেরাতসহ সব কিছুর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা। যখন এসবের প্রতি মানুষ বিশ্বাস স্থাপন করবে তখন মানুষের ভেতরে এক ধরনের জবাবদিহিতার ভয় জন্মাবে, যাতে করে মানুষ নিজের থেকেই নিজে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং যা ইচ্ছে তা করা থেকে বিরত থাকবে। কেননা মানুষ তখন ভাববে যে, আল্লাহর নির্দেশিত পথের বাইরে গেলে তাকে হাশর, মিজান, কবর, ফেরেশতা, জাহান্নাম ইত্যাদির সম্মুখীন হতে হবে। এই চেতনা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হলেই মানুষ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে উঠবে। আর মানুষ যদি আল্লাহর তৈরি এসব বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করা থেকে বিরত থাকে এবং যা ইচ্ছে হয় তাই করতে থাকে, তাহলে আল্লাহর কোনো লাভ বা ক্ষতি হবে না। যা হওয়ার তা সবই হবে বান্দার জন্য। আল্লাহ বলেন, ‘যে সৎ কর্ম করে সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং যে মন্দ কাজ করে তার শাস্তি সেই ভোগ করবে (সূরা হামিম : ৪১) আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসের দ্বারা মানুষ নিয়ন্ত্রিত হলে সমাজ নিয়ন্ত্রিত হবে। সমাজে ভারসাম্য স্থিতি থাকবে এবং এই ভারসাম্য স্থিতির মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে শান্তি শৃঙ্খলা বিরাজ করবে
ইবাদত হিসেবে নামাজের স্থান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তার বান্দার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একমাত্র ইবাদত হচ্ছে নামাজ। কুরআন মজিদে অসংখ্যবার নামাজের ব্যাপারে তাগিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন- ‘নামাজকে প্রতিষ্ঠিত করো, জাকাত প্রদান করো এবং আল্লাহর রুজ্জুকে সম্মিলিতভাবে ধারণ করো, এর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।নামাজ আল্লাহর উদ্দেশ্যে পড়া হয়ে থাকলেও নামাজের অবদান সম্পূর্ণভাবে মানুষ ভোগ করে থাকে। পবিত্র কুরআন ঘোষণা করছে- ‘অবশ্যই নামাজ অশ্লীল খারাপ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে।তাহলে দেখা যাচ্ছে, নামাজি ব্যক্তির দ্বারা কোনো প্রকার খারাপ কাজ সংঘটিত হচ্ছে না, যাতে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বা নামাজির দ্বারা মানুষ কষ্ট পেতে পারে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এখানেও নামাজ পড়ার কারণে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সততা অর্জন করছে এবং তার সততার সুফল সে নিজে ভোগ করছে, সেই সাথে তার সমাজও ভোগ করছে। আধ্যাত্মিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যম হচ্ছে সিয়াম বা রোজা। রোজার মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন বৈধ কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা, অহঙ্কার, হিংসা-বিদ্বেষ থেকে নিজেকে বিরত রেখে আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জন করে। এটিও আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত ইবাদত। রোজা রাখার কারণে মানুষ যখন বৈধ জিনিসের প্রতি লালসা, প্রত্যাশা প্রাপ্তি থেকেও নিজেকে সংযত রাখে; নিজে সংবরণ করে, তখন তার কাছে অবৈধ ভোগ-বিলাস হয়ে পড়ে গৌণ তুচ্ছ। বৈধ জিনিস চরিতার্থ করলে সমাজকে বা অন্য মানুষকে কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় না, কিন্তু অবৈধ বস্তু চরিতার্থ করলে তার দ্বারা অন্য মানুষের দুঃখ কষ্ট বহুগুণে বেড়ে যায়, যা রোজার বিধানে বিশ্বাসী ব্যক্তির দ্বারা করা সম্ভব নয়। আল্লাহ ঘোষণা করেন- ‘অবশ্যই রোজা তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববতী লোকদের ওপর করা হয়েছিল; যাতে তোমরা তাকওয়া বা পরহেজগারিতা অর্জন করতে পারো।এখানে তাকওয়া অর্জনের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর ভয়ে অন্যায় কর্ম থেকে বিরত থাকা। তাহলে অন্যায় কর্ম থেকে বিরত থাকলে উপকৃত হবে কে? উপকৃত হবে রোজাদার নিজে এবং সমাজের অন্যসব মানুষ। কাজেই রোজার মাধ্যমে যদি প্রত্যেক মানুষ তার আত্মার পরিশুদ্ধতা অর্জন করতে পারে, তবে সেই মানুষগুলো সমাজে সোনার মানুষে পরিণত হবে এবং এসব সোনার মানুষের কাছ থেকে যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে, সেসব সুযোগ-সুবিধা আল্লাহ পাক গ্রহণ করেন না, তার সমুদয় সুবিধা গ্রহণ করেন সমাজের সব স্তরের জনসাধারণ। জাকাত, হজসহ সব ধরনের ইবাদত যা বান্দার সাথে সম্পৃক্ত তার উদ্দেশ্য লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের কল্যাণ সাধন; সেই সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। জাকাতের অর্থ বিলি-বণ্টন ব্যবস্থা মানুষের তথা সমাজের দারিদ্র্য কমিয়ে আনে। মানুষের মধ্যে সমতা অর্থনৈতিক ভারসাম্যতা রক্ষা করে শ্রেণী বৈষম্য কমায়। ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অহঙ্কারের ব্যবধান হ্রাস করে। আল্লাহ বলেন- ‘নিশ্চয় ধনীদের সম্পদে দরিদ্রদের অধিকার রয়েছে।জাকাতের কোনো অর্থ-সম্পদই আল্লাহ গ্রহণ করেন না, এর সমুদয় অর্থ-সম্পদ জাকাত প্রদানকারী ব্যক্তির (অগ্রাধিকার ভিত্তিতে) নিকটাত্মীয় এবং চার পাশের মানুষই গ্রহণ করে থাকেন। এখানেও জাকাতের অর্থ-সম্পদ সবই সাধারণ মানুষদের বিলিয়ে দেয়া হয়, আল্লাহ উদ্দেশ্য মাত্র
হজের আনুষ্ঠানিকতা পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সাথে সাথে বিশ্বমুসলিম ভ্রাতৃত্বের সৌহার্দ্য সাম্য পারস্পরিক মতবিনিময়ের দ্বারা মুসলিম উম্মাহর অগ্রগতি উন্নতির পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়। হজের আত্মত্যাগে মানুষ একে অন্যের সাহায্যকারীর শিক্ষা অর্জন করে। আল্লাহর রাসূলদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে রাসূলের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে নিজেদের সমাজে ফিরে আসেন। এই ফিরে আসা হাজীরা সমাজের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করার চেষ্টা করেন। এখানেও আল্লাহর কোনো উপকার হয় না, উপকার হয় মানুষের, মুসলিম উম্মাহর
পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা, নিকটাত্মীয়দের প্রতি গুরুত্বারোপ, অনাথ, এতিম, ফকির-মিসকিনদের প্রতি দায়িত্ববোধ, প্রতিবেশীদের খোঁজখবর করা বিপদাপদে আন্তরিকতার সাথে পাশে থাকা এবং সমাজের সব মুসলিম অমুসলিমের মানবিক প্রত্যাশার প্রতি যত্নশীল হওয়ার মতো বান্দা সম্পর্কিত ইবাদতের প্রতিফলও মানুষই ভোগ করে থাকেন। এখানেও ইবাদতকারী ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম পালন করার মাধ্যমে, পিতা তার সন্তানের কাছ থেকে, সন্তান পিতার কাছ থেকে; স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে, স্বামী স্ত্রীর কাছ থেকে; প্রতিবেশী তার প্রতিবেশীর কাছ থেকে, এতিম-অনাথ তার নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে পরস্পর উপকৃত হয়। এভাবে পারস্পরিক সম্পৃক্ত এসব ইবাদত প্রত্যেক মানুষের শান্তি নিরাপত্তার গ্যারান্টি হয়ে যায়। মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে একে অন্যের সাথে বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত। সবাই সবার কাছে কোনো না কোনোভাবে দায়বদ্ধ কিংবা সহযোগিতা প্রত্যাশী। বান্দাসংশ্লিষ্ট ইবাদতের মাধ্যমে এই দায়বদ্ধতার দায়িত্ব থেকে মুক্তি অর্জন এবং সুশৃঙ্খল মানবিক অধিকার সচেতন টেকসই সমাজব্যবস্থার প্রবর্তনই এসব ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য। যদিও প্রতিটি ইবাদত আল্লাহর উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তবুও এর অন্তর্নিহিত সব সুবিধা মানুষই উপভোগ করে থাকেন। যেমন কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য আয়োজিত দোয়াখায়ের অনুষ্ঠানে প্রস্তুতকৃত খাদ্যসামগ্রী মৃত ব্যক্তি গ্রহণ করেন না, সব খাদ্য অনুষ্ঠানে আগত মেহমানেরাই ভোগ করে থাকেন, মৃত ব্যক্তি উপলক্ষ মাত্র। এভাবেই আল্লাহ শুধু দেখতে চান বান্দা তার আদেশ-নিষেধ ঠিকমতো পালন করছেন কি না। আল্লাহ বলেন- ‘তাদের গোশতও আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, তাদের রক্তও না কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (হজ-৩৭) অন্য এক আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন- ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু জীবন; যেন পরীক্ষা করে দেখতে পারেন কাজকর্মে তোমাদের মধ্যে কে সর্বোত্তম; তিনি মহাশক্তিমান ক্ষমা দানকারী (সূরা মূলক : ০২)


Sunday, February 23, 2014

মায়ের চেয়ে আল্লাহ বেশি দয়ালু

মায়ের চেয়ে আল্লাহ বেশি দয়ালু


আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, এক মিসকিন মহিলা তার দুটি কন্যাকে (কোলে) বহন করে আমার কাছে এলো আমি তাকে তিনটি খুরমা দিলাম অতঃপর সে তার কন্যা দুটিকে একটি করে খুরমা দিল এবং সে নিজে খাবার জন্য একটি খুরমা মুখ পর্যন্ত তুলল কিন্তু তার কন্যা দুটি সেটিও খেতে চাইল সুতরাং মহিলাটি যে খেজুরটি নিজে খেতে ইচ্ছা করেছিল সেটিকে দুই ভাগে ভাগ করে তাদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন আয়েশা (রা.) বলেন, তার অবস্থা আমাকে অভিভূত করল সুতরাং আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে মহিলাটির বর্ণনা করলাম নবী করিম (সা.) বললেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তার জন্য তার কাজের বিনিময়ে জান্নাত ওয়াজিব করে দিয়েছেন অথবা তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন'
http://www.bd-pratidin.com/assets/images/news_images/2014/02/23/alazhar_44968.jpg
এক বর্ণনায় আছে, মা আয়েশা ওই মহিলা তার মেয়েদের অভাব ক্ষুধা দেখে কাঁদতে লাগলেন অতঃপর নবী (সা.) বাসায় এলে তিনি তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন মা আয়েশা ওই ঘটনা বর্ণনা করলে নবী করিম (সা.) ওই হাদিস বর্ণনা করলেন

অন্য এক বর্ণনায় আছে নবী করিম (সা.) বললেন, 'যাকে এই কন্যা সন্তান দিয়ে কোনো পরীক্ষায় ফেলা হয়, তারপর যদি সে তাদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করে তাহলে কন্যারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে অন্তরাল হবে' সূত্র : বুখারি, মুসলিম

'আত্বা ইবনু আবু বারাহ (রাহ.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা আমাকে ইবনু আব্বাস (রা.) বললেন : আমি কি তোমাকে একটি জান্নাতি মহিলা দেখাব না? আমি বললাম, হাঁ তিনি বললেন, এই কালো মহিলাটি মহিলাটি একবার নবী (সা.)-এর কাছে গিয়ে বলল : হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমি মৃগী রোগে আক্রান্ত হই এবং উলঙ্গ হয়ে যাই তাই আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন নবী (সা.) বললেন : তুমি ইচ্ছা করলে ধৈর্য ধারণ কর, এতে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে আর যদি চাও তবে আমি দোয়া করব আল্লাহ যেন তোমাকে আরোগ্য দান করেন মহিলাটি বলল : আমি ধৈর্য ধারণ করব তবে দোয়া করুন যেন উলঙ্গ না হয়ে যাই নবী করিম (সা.) তার জন্য সেই দোয়া করলেন সূত্র : সহীহ বুখারি
মাওলানা আবদুর রশিদ তত্ত্ববাদী,  লেখক : খতিবসারুলিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদঢাকা

সূত্র – বাংলাদেশ প্রতিদিন

Tuesday, February 11, 2014

হালাল উপার্জন উত্তম ইবাদত

হালাল-উপার্জন উত্তম ইবাদত

৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, শুক্রবার, ৮:২৯
ইসলামে ব্যবসায়-বাণিজ্য করা একটি উত্তম কাজ। ব্যবসায় করা আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ। এই পৃথিবীতে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য প্রেরিত বহু নবী-রাসূল ব্যবসায় করেছেন।  সাহাবায়ে কেরাম, তাবে-তাবেইন, আউলিয়া কেরামেরা ব্যবসায় করেছেন। আমাদের হানাফি মাজহাবের ইমাম হজরত ইমাম আবু হানিফাও র: একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসায় করা হালাল। ইবাদতের দশ ভাগের নয় ভাগ হালাল খাদ্যের মধ্যে নিহিত। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা ক্রয়-বিক্রয় হালাল (বৈধ) করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন’ (সূরা বাকারা : ২৭৫)। হজরত রাফে বিন খাদিজ রা: থেকে বর্ণিত একদা জিজ্ঞাসা করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সা:।  কোন প্রকার উপার্জন উত্তম? তিনি বললেন, ‘মানুষের দুই হাতের কাজ ও হালাল ব্যবসায় উপার্জন’ (আহমদ, মিশকাত, পৃষ্ঠা-২৪১)।
হালাল ব্যবসায়-বাণিজ্যের মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাতের প্রভূত কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এর দ্বারা সহজেই আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করা যায়। তবে ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অবশ্যই কিছু আচরণবিধি আছে। তা মেনে ব্যবসায় করলেই সফলতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছা সম্ভব। ইসলাম কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক ব্যবসায় করার ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে এবং তা করার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছে। প্রয়োজনে এ উদ্দেশ্যে বিদেশ সফরের জন্য উৎসাহ দিয়েছে এবং এ কাজকে আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান বলেছেন। উপরন্তু ব্যবসায়ের জন্য যারা বিদেশ সফর করেন তাদের আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘কিছু লোক আল্লাহর অনুগ্রহের সন্ধানে বিদেশ সফর করবে এবং অপর কিছু লোক আল্লাহর পথে জেহাদ করবে’ (সূরা মুজাম্মিল : ২০)।
আমাদের প্রিয়নবী সা: ব্যবসায় করেছেন। তিনি যে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই মক্কা শহর সমগ্র আরব উপদ্বীপের মধ্যে একটি বিশেষ ও বিশিষ্ট ধরনের ব্যবসায় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। হজরত ইবরাহিম আ: দোয়া করেছিলেন, ‘অতএব, হে আল্লাহ আপনি লোকদের মনকে তাদের প্রতি আগ্রহী বানিয়ে দিন এবং তাদের রিজিক দিন নানা প্রকার ফলমূল দিয়ে, যেন তারা শোকর করতে পারে’ (সূরা ইবরাহিম : ৩৭)।
এ দোয়াও মক্কাবাসীর জন্য খুবই কল্যাণকর প্রমাণিত হয়েছে। অনুরূপভাবে কুরাইশদের প্রতিও আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ করেছিলেন ‘ইয়ামেনমুখী শীতকালীন ব্যবসায় সফর এবং সিরিয়ামুখী গ্রীষ্মকালীন ব্যবসায় সফরে সুষ্ঠু এ নিরাপদ ব্যবস্থা করে দিয়ে। আর তাদের এ সফরকালীন নিরাপত্তা ছিল আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এবং তা করা হয়েছিল এ জন্য যে, তারা কাবাঘরের খেদমত করত।
পবিত্র কুরআনের পাশাপাশি হাদিস শরিফে প্রিয়নবী সা: ব্যবসায়-বাণিজ্যের ব্যাপারে বিপুলভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। এ বিষয়টি তাঁর কাছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রথমত যে বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো মূলধন। ব্যবসায় যেহেতু হালাল, অতএব এর মূলধনও হতে হবে হালাল বা পবিত্র। যিনি ব্যবসায় করবেন তার নিয়ত থাকতে হবে ভালো। ব্যবসার ক্ষেত্রে সততা হচ্ছে অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। কারণ সততা বা সত্যবাদিতার দ্বারাই একজন ব্যবসায়ী কাক্সিত লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রিয়নবী সা: এরশাদ করেছেন, ‘সত্যবাদী, আমানতদার, বিশ্বাসী ব্যবসায়ী নবী, সিদ্দিক ও শহীদগণের সাথে থাকবেন’ (তিরমিজি, মিশকাত, পৃষ্ঠা. ২৪৩)।
ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক সময় অতিরিক্ত কথা বলা হয়, পণ্য বিক্রির জন্য আবার মিথ্যা কসম করা হয়। এসব কিছু পরিহার করতে হবে। প্রিয়নবী সা: ব্যবসায়ীদের প্রতি লক্ষ করে বলেছেন, ‘হে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়! ব্যবসায় বেহুদা কথা এবং নিষ্প্রয়োজন কসম করা হয়ে থাকে (যা গুনাহ বলে পরিগণিত হয় তার প্রায়শ্চিত্তে)। তোমরা ব্যবসায় করার সাথে সাথে সদকা করো’ (আবু দাউদ, মিশকাত- পৃষ্ঠা: ২৪৩)।
হালাল ব্যবসার ক্ষেত্রে ধোঁকাবাজি বিরাট প্রতিবন্ধক। অনেকে ব্যবসায় ক্রেতার সাথে ধোঁকাবাজি বা মারাত্মক প্রতারণা করে থাকে, যা আদৌ উচিত নয়। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, ‘একদা প্রিয়নবী সা: (বিক্রয়ের জন্য স্তূপীকৃত) খাদ্যদ্রব্যের এক স্তূপের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তার ভেতর হাত ঢুকালেন। অতঃপর তাঁর আঙুল ভিজে গেল। তিনি খাদ্যের মালিককে বললেন, একি? সে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ সা: বৃষ্টির পানিতে এগুলো ভিজে গিয়েছিল। প্রিয়নবী (সা:) বললেন, ভিজাগুলোকে খাদ্যের উপরিভাগে কেন রাখলে না? যাতে লোকেরা তা দেখতে পায়। অতঃপর প্রিয়নবী সা: বললেন, যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি করে তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই’ (মুসলিম, মিশকাত- পৃষ্ঠা: ২৪৮)।
ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিক্রেতা ত্রুটিযুক্ত মাল না বলে ক্রেতার কাছে বিক্রি করে। এটাও একধরনের অন্যায় এবং বিরাট প্রতারণা। হজরত ওয়াসিলা বিন আসকা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি প্রিয়নবী সা:-কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি কোনো ত্রুটিযুক্ত বস্তুকে এর ত্রুটি না জানিয়ে বিক্রি করবে সে সর্বদা আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে নিমজ্জিত থাকবে অথবা বলেছেন, সর্বদা তার প্রতি ফেরেশতাগণ অভিশাপ করবেন’ (ইবনে মাজাহ, মিশকাত, পৃষ্ঠা: ২৪৯)। অনেকে পার্টনারে ব্যবসায়-বাণিজ্য করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে উভয়েরই খেয়াল রাখতে হবে যাতে কারো দ্বারা আমানতের খেয়ানত না হয়। কারণ খেয়ানত করা কবিরা গুনাহ। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, প্রিয়নবী সা: এরশাদ করেছেন, ‘ব্যবসায়-বাণিজ্যে দুই শরিকের বা অংশীদারের কোন একজন যে পর্যন্ত খেয়ানতে লিপ্ত না হয় সে পর্যন্ত আমি তাদের সঙ্গেই অবস্থান করি। কিন্তু তাদের কেউ যখন খেয়ানত শুরু করে, তখন আমি তাদের পরিত্যাগ করি। অন্য এক বর্ণনা মতে, তখন তাদের মাঝখানে শয়তান এসে যায়’ (আবু দাউদ)। প্রিয়নবী সা: ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে মুজাহিদ ও শহীদদের সমান মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। কেননা, জিহাদ কেবলমাত্র যুদ্ধের ময়দানেই অনুষ্ঠিত হয় না, বরং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এই জিহাদ অবশ্যম্ভাবী।
ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে আমাদের পথ প্রদর্শনের জন্য প্রিয়নবী সা:-এর কর্মনীতিই যথেষ্ট। তিনি যেমন আধ্যাত্মিক দিকের প্রতি পূর্ণমাত্রায় গুরুত্বারোপ করেছেন, তেমনি মদিনায় তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য খালেস বাজার সৃষ্টি করেছিলেন, যার ওপর অন্য কারো কোনো কর্তৃত্ব বা আধিপত্য ছিল না। পূর্ব থেকে চলে আসা ‘বনু কায়নুকা’ বাজার ইহুদিদেরই কর্তৃত্বাধীন ছিল। প্রিয়নবী সা: কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাজারের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ম-কানুন নিজেই প্রচলন করেছিলেন এবং নিজেই দেখাশোনা করতেন। এ বাজারটির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল যে, সেখানে কোনো প্রকার ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, ঠকাঠকির কারবার বা মাপে-ওজনে কম-বেশি অথবা পণ্যদ্রব্য আটক করে লোকদের কষ্ট দেয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। প্রিয়নবীর সা: সাহাবিদের মধ্যে বেশির ভাগ আনসার কৃষিকাজ করতেন। আর মুহাজিররা সাধারণত ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। এমনই একজন মহান সাহাবি হলেন হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা:। তিনি মুহাজির ছিলেন। তার দ্বীনি ভাই সাদ ইবনে আনসারী রা: তাকে তার অর্ধেক সম্পদ, দু’টি বাড়ির একটি এবং দু’জন স্ত্রীর মধ্য থেকে একজন স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তার কাছে বিবাহ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি এ বিরাট ত্যাগের জবাবে অনুরূপ বিরাট আত্মসম্মন বোধ দেখালেন। তিনি সাদকে বললেন, আল্লাহ আপনার ধনসম্পদ ও পরিবার পরিজনে বরকত দিন, আমার ওসবের দরকার নেই। এখানে ব্যবসায় করার জন্য কোনো বাজার থাকলে আমাকে দেখিয়ে দিন, আমি ব্যবসায় করব। হজরত সাদ রা: তাকে বনু কায়নুকার বাজার দেখিয়ে দিলেন। পরের দিন তিনি পনির ও ঘিসহ বাজারে গিয়ে তা বিক্রি করেন। তিনি এ ব্যবসায় করে প্রচুর সম্পদ উপার্জন করেন। মৃত্যুর সময় তিনি এক বিপুল বিত্ত-বৈভব রেখে গিয়েছিলেন। হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা:-এর দৃষ্টান্ত আরোও ভাস্বর। তিনি বরাবর ব্যবসাই করেছেন। এ জন্য প্রাণপণ খাটাখাটুনি করতেন। এমনকি খলিফা নির্বাচিত হওয়ার দিনও তিনি বাজারে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিলেন।
ইসলামে ব্যবসায় হারাম নয়, তবে যে ব্যবসায়ে জুলুম, ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, ঠকবাজি, মুনাফাখোরী কিংবা কোনো কোনো নিষিদ্ধ জিনিসের ক্রয়-বিক্রয়, উৎপাদন হয় তা নিশ্চয়ই হারাম। সুদি ব্যবসায় করা চলবে না। কেননা সুদকে-সুদি কারবারলব্ধ মুনাফাকে আল্লাহ তায়ালা নির্মূল করে দেন। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘কোনো লোক যদি সুদের একটি দিরহামও জেনেশুনে খায় তবে তা ৩৬ বার জেনা করার চেয়েও বড় গুনাহ।’ (আহমদ)। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা যদি ব্যবসায়-বাণিজ্যের আচরণবিধি যথাযথভাবে মেনে চলে ব্যবসায় করেন তাহলে একটি উন্নত জাতি গঠন করা সহজ হবে সন্দেহাতীতভাবে।
মাওলানা বায়েজীদ হোসাইন সালেহ: খতিব, খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (র:) জামে মসজিদ, ঢাকা।
সূত্র - দৈনিক নয়াদিগন্ত।

আল্লাহর পথে ব্যয়ের ফজিলত

আল্লাহর পথে ব্যয়ের ফজিলত

৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, শুক্রবার, ৮:২৮
আমাদের সমাজে দেখছি, অনেক মেয়ে চাকরিতে ঢুকলেও তাদের উপার্জনের কিছু অংশ কোনো জনকল্যাণমূলক কাজ বা দ্বীনের পথে খরচ করছেন না। অথচ হজরত খাদিজা রা: কুরাইশদের মধ্যে একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ছিলেন। দাওয়াত ও রিসালাতের শুরু থেকেই রাসূলুল্লাহ সা:-কে সাহায্য করে গেছেন। দ্বীনের পথে সব রকমের কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করেছেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলে থাকেন, রিসালাতের শুরুতে খাদিজা রা:-এর কাছে ২৫ হাজার দিরহাম ছিল, কিন্তু আট-নয় বছরে সঞ্চয়গুলো তিনি দাওয়াতের কাজে বিলিয়ে দিয়েছেন। তা ছাড়া ঈমান আনতে গিয়ে ঘর থেকে বিতাড়িত হওয়া মুসলমানদের তিনি ব্যয়ভার গ্রহণ করতেন।
এ দিকে বর্তমানে বেশির ভাগ মেয়ে তাদের উপার্জনের টাকা শুধু নিজের জন্য খরচ করছেন। না, নিজের জন্য খরচ করার বিরোধিতা করছি না। তবে একটা বিষয় আমরা ভেবে দেখতে পারি তাহলো- এক দিনে ৫০০ টাকাও খরচ করা যায় আবার ৫০ হাজার টাকাও খরচ করে ফেলা যায়। হাতে টাকা থাকলে প্রয়োজন চলে আসে, সেটা নিজের জন্য হোক কিংবা অন্য কাউকে খুশি করার জন্য হোক। তবে আমাদের যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে পরিকল্পনা। উপার্জনের ২০ শতাংশ বা তার চেয়ে কম জনকল্যাণমূলক কাজে, যা এলাকাভিত্তিকও হতে পারে। যেমন- সরকারিভাবে লাগানো রাস্তার কলটি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে বা সারা দিন পানি পড়েই যাচ্ছে। এবার না হয় ব্যক্তি উদ্যোগে কলটি মেরামত করে ফেলি। অনেকে হয়তো বলবেন- ‘এটা তো সরকারের দায়িত্ব, আমরা করব কেন’? হ্যাঁ, ঠিক। তবে সরকার আসার আগে আমরা এই কাজটি করে ফেললে সরকার যে কাজটি করতে পারেনি সেই কাজটি আমরা হয়তো ভালোভাবেই করে ফেলব। এতে এলাকার লোকজন উপকৃত হবে এবং ভালো কাজে সহায়তাও করবে।
রইল দ্বীনের পথে খরচের কথা। এটাও নিজ থেকেই শুরু করা যায়। জানার শেষ নেই। আমাদের জ্ঞানের পরিধি সীমিত। টেক্সট বইয়ের বাইরে বই কিনে পড়া যায়। হ্যাঁ, অনেকে বলবেÑ এখন তো নেটেই সব পাওয়া যায়। হ্যাঁ, নেটে সব কিছু আছে সুবিধার জন্য, তবে আমরা যখন টাকা খরচ করে বই কিনব তখন পড়ার প্রতি আমাদের একটা ঝোঁক থাকবে। আমাদের সর্বপ্রথম ধর্মীয় বই পড়া উচিত, কারণ এরপর আমরা যেকোনো বিষয়ের বই পড়ি না কেন ইনশাআল্লাহ বিভ্রান্ত হবো না। আরেকটি বিষয় আমাদের সমাজে অনেকেরই ধর্মীয় জ্ঞান কম থাকার থাকার কারণে অথবা পর্যাপ্ত পরিমাণ না থাকার কারণে। এমন সব কথা বলেন, আর নীতিনির্ধারকেরা এমন সব নীতি প্রণয়ন করেন, যা ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং ধর্মের সাথে কোনটি সাংঘর্ষিক, আর কোনটি নয়, আর ধর্ম সব কিছুর সমাধান দিচ্ছে কি না, কিভাবে দিচ্ছে, সেটা জানার জন্যও নিজেকে জানতে হবে। তা না হলে কে কী বলল সেটা নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়ে যাবে।
আমরা অনেক সময় বলি, ‘ছেলেরা নারীনীতি নিয়ে এত কথা কেন বলে? আমাদেরটা আমরাই বুঝি।’ হ্যাঁ, আমাদেরটা আমরা কতটুকু বুঝেছি, যা বুঝেছি সেটা সঠিক কি না, ধর্ম কী বলে, নারীনীতি কেমন হওয়া উচিত, সমাজ কোন পথে চলছে, কী শিখছি আমরা, আদৌ পরিবর্তনের দরকার আছে কি না বা সব ঠিক আছে কি নাÑ সেটা উপলব্ধি করতে হলে নিজেকে নিজেই জানাতে হবে। আর আমরা যদি না জানি সে েেত্র অন্যরা বললে তার বিরোধিতা করার মানে হয় না। সুতরাং প্রথমত, নিজেকে দ্বীনের পথে আনতে নিজের জন্য টাকা খরচ করতে হবে এবং আরেকটা হতে পারে যারা দ্বীনের পথে কাজ করে তাদের জন্য টাকা খরচ করা।
এ দিকে সমাজে আরেকটা সমস্যা দেখি, অনেক মেয়ে ভালো পথে টাকা দিতে আগ্রহী হলেও তারা জানেন না দেবেন কোথায়? কিংবা জানেন না কোন বইটি পড়া দরকার। তাই বলতে হয়, যারা জানেন (আপনি যাদের ভালো মনে করেন) তাদের জিজ্ঞাসা করুন।
পরিশেষে আমরা জানি, ছেলেদের ওপর পরিবারের আর্থিক যে চাপ থাকে মেয়েরা কিন্তু সে দিকটা থেকে অনেকটাই মুক্ত। বাবা কখনো মেয়ের কাছ থেকে টাকা চাইবে না আর স্ত্রী তার স্বামীকে টাকা দিতে বাধ্য নয়। সুতরাং সমাজ গঠনে নারীর অংশগ্রহণ ও সহায়তা কাম্য। যার জন্য মানসিকভাবে তৈরি হওয়া উচিত।  
ফাতেমা মাহফুজ : প্রবন্ধকার
সূত্র - দৈনিক নয়াদিগন্ত। 

নামাজের অবিশ্বাস্য ১১ টি উপকারিতা

আসুন জেনে নিই !  নামাজের  অবিশ্বাস্য ১১ টি উপকারিতাঃ

.  নামাজে যখন সিজদা করা হয় তখন আমাদের মস্তিস্কে রক্ত দ্রুত প্রবাহিত হয় ফলে আমাদের স্মৃতি শক্তি অনেকবৃদ্ধি পায়

. নামাজের যখন আমরা দাড়াই তখন আমাদের চোখ জায়নামাজের সামনের ঠিক একটি কেন্দ্রে স্থির অবস্থানে থাকে ফলে মনোযোগ বৃদ্ধি পায়

Monday, February 3, 2014

দ্বীন প্রচারের মিশনে শেষ হলো বিশ্ব ইজতেমা


দ্বীন প্রচারের মিশনে শেষ হলো বিশ্ব ইজতেমা



২০১৪ সালের  ইজতেমার ২য় পর্বের আখেরি মুনাজাতে মুসল্লিদের একাংশ 

দ্বীন প্রচারের মেহনতে সময় ব্যয় করার মহান প্রত্যয় নিয়ে শেষ হলো তাবলিগ জামাতের ৪৯তম বিশ্ব ইজতেমা। দেশ-বিদেশে দ্বীনের দাওয়াত দিতে প্রায় ছয় হাজার জামাত ইজতেমা ময়দান ত্যাগ করছে। নবী-রাসূলদের এ মহতী কাজের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে দুনিয়া ও আখিরাতের কামিয়াবিই তাদের লক্ষ্য। দুই দফায় ছয় দিনের ইজতেমায় তাবলিগি কাজেরই দীক্ষা গ্রহণ করেছেন লাখো লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমান। শুধু ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনেই নয়; তারা দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিতে চান সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। শ্বাশত ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে জড়ো করতে চান পথহারা লক্ষ্যভ্রষ্ট বিপথগামী মানুষদের। বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মুনাজাতে কেবল নিজের পাপ মোচনের উদ্দেশে নেন না বরং তাবলিগের (দ্বীন প্রচারের) দীক্ষা নিতেই ইজতেমায় আসেন লাখো লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলিম। ইজতেমায় (সমাবেশে) তিন দিন অবস্থানের সুযোগে প্রতি ওয়াক্তে লাখো মুসল্লির কাতারে দাঁড়িয়ে বৃহত্তর জামাতে নামাজ পড়ার নেকি হাসিলের পাশাপাশি অন্যান্য ইবাদতেও সংখ্যাধিক্যের নেকি রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন তারা। এ দিকে আগামী বছর ২০১৫ সালে ইজতেমা শুরু হবে ৯ জানুয়ারি।
আখেরি মুনাজাত : উম্মতে মোহাম্মাদির মাগফিরাত, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভ, নবী-রাসূল, সত্যবাদীদের সাথে হাশর-নশর ও জান্নাত কামনা, মুসলিম জাহানের মজবুতি ঈমান, দ্বীনের মেহনত, সুন্নতি জীবন, নামাজে খুসুখুজু তৈরি, দ্বীন ইসলামের হেফাজত, ইজতেমাকে কবুল, দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় অক্যাণ থেকে রা এবং কল্যাণ কামনা করে মহান আল্লøাহর দরবারে মুনাজাত করেন দাওয়াতে তাবলিগের অন্যতম শীর্ষ মুরুব্বি ভারতের মাওলানা যোবায়েরুল হাসান। আখেরি মুনাজাত শুরু হয় সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে। শেষ হয় ১০টা ১২ মিনিটে। ১৭ মিনিট স্থায়ী মুনাজাতে লাখো লাখো মুসল্লির অশ্রুসিক্ত নয়নে আমিন, আমিন ধ্বনিতে ইজতেমা ময়দান ও আশপাশ এলাকা মুখরিত হয়ে উঠে। প্রথম পর্বের ইজতেমার আখেরি মুনাজাতে ময়দানের বাইরে চারপাশের বিস্তৃর্ণ এলাকায় মাইক সংযোগ দেয়া হলেও দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মুনাজাতে সেই ব্যবস্থা না থাকায় এবং দ্বিতীয় দফার আখেরি মুনাজাত নির্ধারিত সময়ের আগে ও সংক্ষিপ্ত সময়ে শেষ হওয়ায় লাখো মুসল্লি মুনাজাতে অংশ নেয়া থেকে বঞ্চিত হন। আখেরি মুনাজাত নিয়ে তুরাগ তীরসহ পুরো টঙ্গী ও আশপাশের এলাকা মুসল্লিদের পদচারাণায় মুখর হয়ে উঠে। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি সমৃদ্ধি কল্যাণ কামনা করে ভাবগম্ভীর পরিবেশে অশ্রুভেজা ফরিয়াদে লাখো হাতের আকুতিতে ময়দানে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। থেকে থেকে আমিন, ছুম্মা আমিন ধ্বনি সেই নীরবতাকে ভঙ্গ করে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আখেরি মুনাজাতের আগে দাওয়াতে মেহনতের ওপর বয়ান করেন ভারতের মাওলানা সা’দ। 
আখেরি মুনাজাতে অংশ নিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় তুরাগতীরসহ আশপাশের সব এলাকা। ভেতরে জায়গা না পেয়ে মানুষ রাস্তায় অবস্থান নেয়ায় বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। একই সাথে বন্ধ হয়ে যায় আশুলিয়া ও নরসিংদী সড়ক। লাখো লাখো ধর্মপ্রাণ মানুষের মিলনমেলায় তুরাগতীর বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দলে দলে রাস্তায় মানুষের যাতায়াতের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ঢাকার আব্দুল্লাহপুর থেকে ঢাকা-ময়মনিসংহ মহাসড়কের জয়দেবপুরের চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত মহাসড়কে কোনো গণপরিবহন চলেনি। ইজতেমার কাজে নিয়োজিত ও সরকারি কাজে ব্যবহৃত গাড়ি ছাড়া গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকে। 
আখেরি মুনাজাতে অংশ নিতে গতকাল ভোর থেকেই টঙ্গীর ইজতেমা অভিমুখে শুরু হয় মানুষের ঢল। টঙ্গীর পথে গতকাল ভোর থেকেই ঢাকা-ময়মনসিং মহাসড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মুনাজাতে অংশ নিতে চার দিক থেকে লাখো লাখো মুসুল্লি হেঁটে ইজতেমাস্থলে  পৌঁছেন।
আখেরি মুনাজাতের জন্য গতকাল আশপাশের শিাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছিল ছুটি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ছুটি  ঘোষণা না করলেও কর্মীদের মুনাজাতে অংশ নিতে বাধা ছিল না। বিভিন্ন বয়সী ও পেশার মানুষ এমনকি মহিলারাও ভিড় ঠেলে মুনাজাতে অংশ নিতে গতকাল সকালেই টঙ্গী এলাকায় পৌঁছেন।
মুনাজাতে অংশ নিতে পারেননি লাখো মুসল্লি : নির্ধারিত সময়ের বহু আগেই আখেরি মুনাজাত সম্পন্ন হওয়ায় লাখো মুসল্লি অংশ নিতে পারেননি এবারের দ্বিতীয় দফার ইজতেমার আখেরি মুনাজাতে। এ ছাড়া ইজতেমা ময়দানের বাইরে অতিরিক্ত মাইক সংযোগ না থাকায় মুনাজাত শেষেও জনতার স্রোত ইজতেমা অভিমুখে যাচ্ছিল। মুনাজাত শেষে ময়দান ছেড়ে দলে দলে মানুষ যখন গন্তব্যে যাচ্ছিলেন তখনো অসংখ্য লোক মুনাজাতে অংশ নিতে ময়দানের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। বিপরীতমুখী মুসল্লিদের স্রোত দেখে ইজতেমা অভিমুখী মানুষ মনে করছিলেন হয়তো ভিড় এড়াতে তারা আগেই নিরাপদ দূরত্বে চলে যাচ্ছেন, যা প্রতি বছরই ঘটে থাকে। মুনাজাত শেষ হয়ে গেছে এ সংবাদে বিশ্বাস না করেই মুসল্লিদের এ স্রোত ইজতেমা অভিমুখে যাচ্ছিল। আখেরি মুনাজাতে অংশ নেয়ার আশায় সকাল ১১টা পর্যন্ত ইজতেমা অভিমুখে মুসল্লিদের এ স্রোত ল্য করা গেছে। অবশেষে মুনাজাতে অংশ না নেয়ার আেেপ ইজতেমা অভিমুখী জনতার এ স্রোত বিপরীতমুখী (ইজতেমা থেকে বহির্গমন) জনস্রোতের সাথে একাকার হয়ে যায়। মুনাজাতে অংশ নিতে না পারায় এসব মুসল্লিকে ােভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। প্রথম দফার ইজতেমার আখেরি মুনাজাতে বহিরাগত মুসল্লিদের অংশ নেয়ার সুবিধার্থে ময়দানের আশপাশের এলাকায় মাইক সংযোগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় দফার আখেরি মুনাজাতে সেই ব্যবস্থা না থাকায় এমনিতেই লাখো মুসল্লি আখেরি মুনাজাতে অংশ নেয়া থেকে বঞ্চিত হন।
ইজতেমা ময়দানের জিম্মাদার তাবলিগ জামাতের স্বাগতিক বাংলাদেশের মুরব্বি ইঞ্জিনিয়ার গিয়াস উদ্দিনের উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রোববার ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে আখেরি মুনাজাত অনুষ্ঠানের সংবাদ ইতঃপূর্বে প্রচারিত হয়ে আসছিল। গত শনিবার বিকেলেও ইজতেমায় তাবলিগ মুরব্বিদের সাথে স্থানীয় সাংবাদিকদের  মতবিনিময়কালে ইঞ্জিনিয়ার গিয়াস উদ্দিন আখেরি মুনাজাতের আলোচিত সময়ের (১১টা-১২টা) কথা নিশ্চিত করেন।
মহিলাদের অংশগ্রহণ : প্রচুরসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মহিলা ইজতেমার মুনাজাতে অংশ নেন। তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থান না থাকায় আখেরি মুনাজাতে বিভিন্ন বাড়ির ছাদে, রাস্তায় বসে হাজার হাজার মহিলা মুনাজাতে অংশ নেন। 
আরো ১ জনের মৃত্যু : তাবলিগ জামাতের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় দফার ইজতেমায় গত শনিবার রাতে আরো একজন মুসল্লি মারা গেছেন। মৃতের নাম আবদুল গণি (৬৫)। তার বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থানার দাড়িয়ানি গ্রামে বলে জানা গেছে। দ্বিতীয় দফার ইজতেমায় বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ট্রাক চাপায় এক মাদরাসা শিক্ষকসহ ৯ জনের মৃত্যু হলো।
ছাদে ১০০ সিটে ২৫০ : এ দিকে আখেরি মুনাজাত শেষে বিভিন্ন পরিবহনে মুসল্লিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। ইজতেমার পূর্বপাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের স্থানীয় মিলগেট বাস স্ট্যান্ডে ময়মনসিংহগামী বাসে ‘ছাদে ১০০, সিটে আড়াই শ’, ভেতরে দাঁড়িয়ে দেড় শ’ টাকা ভাড়ায় হেলপাররা মুসল্লিদের ডাকতে দেখা গেছে। 
ট্রাফিক জ্যাম : আখেরি মুনাজাত নিয়ে সড়ক মহাসড়কগুলো ফুটপাথের ব্যবসায়ী ও মওসুমি ভিক্ষুকদের দখলে ছিল। ফলে মুনাজাত শেষে সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। 
তাবলিগ জামাত ও বিশ্ব ইজতেমা : ১৯১০ সালে ভারতবর্ষের বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ:) তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন রাজস্থানের মেওয়াত এলাকা থেকে। তার নেতৃত্বে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে এ কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৪ সালে মাওলানা ইলিয়াস (রহ:) মৃত্যুর পর তার ছেলে মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী (রহ) শায়খুল হাদিস মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভী, মাওলানা এনামুল হাসান, বাংলাদেশের তাবলিগ জামাতের আমির মাওলানা আবদুল আজিজ এ কার্যক্রম চালিয়ে যান। ১৯৪৬ সালে প্রথম বিশ্ব ইজতেমা শুরু হয় ঢাকার কাকরাইল মসজিদে। ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম হাজী ক্যাম্পে। ১৯৫০ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। ১৯৬৫-৬৭ সালে টঙ্গীর পাগাড় গ্রামে জাকারিয়া জুট মিলে অনুষ্ঠিত হয় খুব ছোট পরিসরে। এরই মধ্যে তাবলিগের কার্যক্রম গ্রাম-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৭ সালে তুরাগ নদীর বর্তমান স্থান নির্ধারণ করা হয়। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার প্রতীকী মূল্যে বর্তমান ১৬১ একরের ময়দান তাবলিগ জামাতকে স্থায়ী বরাদ্দ দেয়।
২০১৫ সালের বিশ্ব ইজতেমা : গত বুধবার বিশ্ব ইজতেমার মুরুব্বিরা পরামর্শ করে আগামী ২০১৫ সালের বিশ্ব ইজতেমার তারিখ নির্ধারণ করেছেন। সে অনুযায়ী আগামী বছরের ৯ জানুয়ারি শুরু হবে ইজতেমার তিন দিনব্যাপী প্রথম পর্ব। আবার চার দিন বিরতি দিয়ে তিন দিনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে ১৬ জানুয়ারি। প্রথম দফার আখেরি মুনাজাত হবে ১১ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় দফার আখেরি মুনাজাত হবে ১৮ জানুয়ারি। বিশ্ব ইজতেমার আয়োজক কমিটির মুরুব্বি প্রকৌশলী মো: গিয়াস উদ্দিন জানান, তাবলিগি প্রচার কাজের সুবিধার্থে ওই তারিখ এ বছরের চেয়ে এগিয়ে আনা হয়েছে।  
দেশ-বিদেশের পথে ৫,৪০০ কাফেলার ইজতেমা ত্যাগ : দেশ-বিদেশে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে বিভিন্ন মেয়াদের চিল্লাধারী (৪০ দিনে এক চিল্লা) পাঁচ হাজার ৪০০ জামাত ইজতেমা ময়দান ত্যাগ করছে। তাদের মধ্যে ইজতেমার প্রথম দফার তিন হাজার ৪০০ ও দ্বিতীয় দফার দুই হাজার জামাত রয়েছে। প্রথম দফার তিন হাজার ৪০০ জামাতে রয়েছে ৭০০ বিদেশী মুসল্লির জামাত। তারা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাবলিগের (দ্বীন প্রচারের) কাজে বেরিয়ে যাচ্ছেন বলে তাবলিগ জামাতের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। 
নবী-রাসূলদের এ মহতী কাজের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে দুনিয়া ও আখিরাতের কামিয়াবিই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। দুই দফায় ছয় দিনের ইজতেমায় সুমহান এ তাবলিগি কাজেরই দীক্ষা গ্রহণ করেছেন লাখো লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলিম। শুধু ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনেই নয়; তারা দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিতে চান সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে।

সূত্র - দৈনিক নয়াদিগন্ত,  আলী ঝিলন ও শেখ আজিজুল হক